মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার

  • 0
বই নিয়ে আমার উৎসাহের সীমা নাই। আমার বন্ধু মাত্রই জানেন আমার বই প্রীতি। আজ আপনাদের সাথে এক অন্যরকম পাঠাগারের গল্প শেয়ার করবো। পাঠাগারের নাম "মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার"।

রাজশাহীতে এসে কোনো সাংস্কৃতিক-ব্যক্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ঘুরে যাননি, এমন ঘটনা কমই ঘটেছে গত ১০ বছরে। ২০০৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর সাংস্কৃতিক-ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী এই পাঠাগারে এসে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারে এলাম এ দেশের মানুষের দুঃসহ যন্ত্রণা মোচনে আরেকটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করার প্রস্তুতিপর্বে। দেশ আজ রসাতলে যেতে বসেছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়বিরোধী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তি রাজাকার, আলবদর ও ঘাতক দালালদের খপ্পরে পড়ে। এই যুদ্ধাপরাধী চক্রকে পরাভূত করতে আমরা আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চাই। তাই পাঠাগারে এসে নিজেকে সমৃদ্ধ করলাম।’

একই বছর ২৮ ডিসেম্বর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির এসে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত মানুষ সৃষ্টির এই প্রয়াস সমগ্র জাতির অভিনন্দনযোগ্য।’ একই দিনে নির্মূল কমিটির আরেক নেত্রী শ্যামলী নাসরীন লিখেছেন, ‘রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আমি সেই দিনের আশায় থাকব, যেদিন এই পাঠাগার মানুষের সত্যিকারের মুক্তির আলো জ্বালবে।’
পাঠাগার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ সাফিকুল আলম। এখন তিনি এর সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘কাজ শুরু করেছিলাম এই ভেবে যে এই পাঠাগার গতানুগতিক কিছু হবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশাপাশি এতে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস—সব বই থাকবে। যার মূল কাজ হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তমনা সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মনে হয়েছিল এ এক নতুন মুক্তিযুদ্ধ। তাই পাঠাগারের নাম মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার।’
পাঠাগারের শুরুটা হয়েছিল ২০০২ সালে। এখন এই পাঠাগারটি রাজশাহীর সব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দিলীপ কুমার ঘোষ জানান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও এই পাঠাগারের পক্ষ থেকে করা হয়। পুঠিয়ায় মহিমা ধর্ষণ ও আত্মহননের ঘটনায় প্রথম মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগারের পক্ষ থেকে পুঠিয়া গিয়ে প্রতিবাদে মানববন্ধন করা হয়। তাঁরা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিশুদের চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, সংগীত, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। প্রত্যন্ত গ্রামে যেখানে দুস্থ মানুষ শহরে এসে চিকিৎসা করাতে পারেন না, নিজের খরচে এমন জায়গায় গিয়ে তাঁরা ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করেন। তাঁদের বধ্যভূমি অনুসন্ধান কমিটি রয়েছে। এই কমিটি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বধ্যভূমি চিহ্নিত করার কাজ করে। তাদের তত্ত্বাবধানেই শুদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত চর্চার প্রতিষ্ঠান ধ্রুবসখা পরিচালিত হয়। প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিকেলে সৈয়দ সাফিকুল আলমের বাসায় ধ্রুবসখার আসর বসে। এর ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
প্রতিটি জাতীয় দিবস পাঠাগারের পক্ষ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়। তিনি জানান, সময় পেলে রাজশাহীর মেয়র থেকে শুরু করে স্থানীয় সাংসদসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ সন্ধ্যায় এই পাঠাগারে আসেন।
সম্প্রতি পাঠাগার পরিদর্শনে গিয়ে দেখা মেলে রাজশাহী থিয়েটারের সাবেক সভাপতি কামারুল্লাহ সরকারের সঙ্গে। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার এখন রাজশাহীর সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঠিকানা হয়েছে। সেখানেই পাওয়া যায় জয় বাংলা সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নিজামুল হুদা লিটন ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামানকে। পড়াশোনা করছেন আরও বেশ কয়েকজন। তাঁদের একটি কক্ষে পড়াশোনা করার জন্য টেবিল পাতা রয়েছে। সেখানে পত্রপত্রিকাও রয়েছে। পাশের কক্ষের তাকিয়ায় প্রায় দেড় হাজার মতো বই সাজানো। সেখান থেকে পছন্দসই বই নিয়ে এসে কেউ খুলে বসেছেন।
নিজামুল হুদা জানান, এই পাঠাগার এখন তাঁদের প্রাণের জায়গা হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিকেলে এখানে আসতেই হয়। তিনি আরও জানান, এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন। ৩১ সদেস্যর কমিটি নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর এর সাধারণ সভা হয়েছে। এতে ১৭০ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

খবরটির সূত্রঃ প্রথম আলো।