খেরোখাতা

  • 1

যা পড়ছি ভালো লাগছে টুকে রাখছি। আগে নিজের নোটবুকে তুলে রাখতাম এখন ব্লগে তুলে রাখি। আমি খেয়াল করে দেখছি নোট করে পড়লে অনেক কিছুই স্মৃতিতে অনেক দিন থেকে যায়। এজন্যই হয়ত স্কুলে স্যাররা বলতেন পড়া হলে বার বার লিখো।
একটা মজার কথা বলি, বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মজার লেখক হলেন, সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি একবার শান্তিনিকেতনে গিয়েছেন কবিগুরু রবিবাবুর সাথে দেখা করতে। সিলেটের বাসিন্দা হওয়ার দরুন তাঁর মুখে আঞ্চলিক টানটা রয়েগেছে। বাড়ি ফিরে যখন সবাই জানতে চাইলো কবিগুরুর সাথে সাক্ষাতের বৃত্তান্ত তখন তিনি বললেন, কবি বলেছেন আমার মুখে এখনও কমলালেবুর গন্ধ।

শহীদ বরকতের স্মৃতিকে মনে করে মুর্তজা বশীর লিখছেন,
ব্যারাকগুলোর দক্ষিণ পাশ দিয়ে একটা চলন্ত জটলা। দৌড়ে গেলাম। বেশ লম্বা, শ্যামবর্ণ, মুখমণ্ডল পরিষ্কারভাবে কামানো, সারা চেহারায় বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় ভরে যাওয়া ঘাম আর পরনের প্যান্টের পেটের নিচ থেকে কল খুলে দেওয়ার মতো অঝোরে রক্তের ঢল। সবার সঙ্গে আমিও তাকে ধরেছি, আমার সাদা পাজামায় কে যেন আবীরের রং পিচকারি দিয়ে ছড়িয়ে রাঙিয়ে দিল। আমি তাকে ধরেছি বুকের কাছে, আমার মাথা তার মুখের কাছে। একসময় সে চোখ তুলে তাকাল। একটা ছোট শিশুর ন্যায় গড়গড় করে নামতা পড়ার মতো করে বলল, আমার বাড়িতে খবর দেবেন...আমার নাম আবুল বরকত...বিষ্ণুপ্রিয় ভবন, পল্টন লাইন...।
পরমুহূর্তে জবাই করা মুরগির মতো হাঁ করে জিব কাঁপিয়ে ফিসফিস করে বলল, পানি। পানি।
বাঁ হাত দিয়ে মৃদুভাবে ধরেছি তার পিঠ, ডান হাতখানা তার বুকের ওপর। সে হাতে রুমালখানা রেখেছি ধরে, যা মুখের ঘাম মোছার কারণে ভেজা আর নোংরা। ভাবলাম কী করব। জিব কাঁপছে অনবরত খোলা মুখের ভেতর। একটু ইতস্তত করলাম। মনে দ্বিধা, এক ধরনের অপরাধ বোধ। কিন্তু তা ক্ষণিকের জন্য। জিবটা বারবার নড়ছে। পরমুহূর্তেই নিংড়িয়ে দিলাম হাতের রুমাল।
বই পড়া একটা নেশার মতো। যারা এই নেশা একবার আশক্ত হয়েছেন তাদের কোনো রিহেবে নিয়েও এই নেশা কাটানো যায় না। বই পড়ার সময় একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাই। আমি লেখার চেয়ে পড়তে পছন্দ করি বেশি। My reading material নামে একটা ফোল্ডার তৈরি করেছি। যেখানে বিভিন্ন লেখা সংগ্রহ করে রাখি আর সময় সুযোগ হলেই পড়ে ফেলি।
লিখতে লিখতে কেনো জানি একটা কথা মাথার মধ্যে ক্লিক করে উঠলো, “কেউ মানুষ হয়ে জন্মায় না, মানুষ আস্তে আস্তে হতে হয়”।
আমি কিন্তু প্রসঙ্গ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছি, কেউ যদি এই লেখা পড়েন দয়া করে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। নিজের মনে লিখে যাবার আনন্দই আলাদা।
ইতিহাসকে সাধারন মানুষের দৃষ্টিকোণ দিয়ে লিখেছেন Haward Zinn। তার বিখ্যাত বই The people history of united states  পড়ে জেনেছি সে কথা। আমাদের দেশের শওকত আলী লিখেছেন প্রদোষে প্রাকৃতজন। তিনি বলছেন, ভাবনাটা এসেছে ইতিহাস পড়তে গিয়ে। দেখেছি বখতিয়ার খলজি আসছে। বিপরীতে লক্ষণ সেনের বিরাট সেনাবাহিনী প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বখতিয়ার খলজির সেনাবাহিনী যখন ভেতরে প্রবেশ করল তখন লক্ষণ সেন নেই। পালিয়ে গেছে। এটা কেন হলো? স্থানীয় লোক এদের প্রতিহত করবে না এই বিশ্বাস থেকে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কৃষক বিদ্রোহ বারবার হয়েছে। কৃষক বা সাধারণ মানুষ এভাবে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়েছে। এখান থেকেই বোধ হয় অনুপ্রেরণাটা এসেছে।
এবারের বইমেলা ২০১১ যে বইটি পড়বার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সেটা হলো “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১নারী”।  একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কেমন ছিলেন বাংলাদেশের নারীরা, আর কী হয়েছিল, কী ঘটছিল তাঁদের জীবনে, তার কোনো কিছুই আমরা জানি না বললে বোধ করি অত্যুক্তি হয় না। এই লজ্জা ও ব্যর্থতার দায়ভার কিছুটা হলেও মোচন করেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ নারী বইটি।
বইটিতে তিন খণ্ডে (৪১+৩১+৪১=১১৩) ১১৩ জন নারীর সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধের সময় শুধু নয়, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট, অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। প্রকারন্তরে যা হয়ে উঠেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অকথিত ইতিহাসের অনিবার্য এক দলিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরের কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। এর বাইরেও যুদ্ধ ছিল। ঘরে ঘরে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে। যার খবর অনেকেই জানি না। স্বাধীনতার ৪০ বছরের দ্বারপ্রান্ত এসেও এসব তালাশ করার প্রয়াস আছে বলে বাস্তব দৃষ্টে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ঘটল আলোচ্য বইয়ের কল্যাণে। প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারীর বিবরণ থেকে সম্পন্ন হওয়া বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা কিছুটা হলেও উপস্থাপিত হয়েছে। যার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলে মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন রূপ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে এবং সবাই মহান মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ও মর্যাদার পেছনে নারীর অবদান কতটা, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।
আজকের মতো এখানেই ইতি টানলাম।