খেরোখাতা পর্ব ২

  • 2
ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে। ঘুম তারাতে তাই কিবোর্ড আর স্ক্রীনকে ধরা অনেকটা কলম হাতে খাতা ধরার মতো। মাঝে মাঝে আমেরিকান অনেক লাইব্রেরীতে তাক লাগিয়ে দেবার মতো কিছু বাংলা বই পাওয়া যায়। যেমন আমি গত সপ্তাহে এরকম কয়েকটি বই পেয়েছি আমার স্থানীয় পাঠাগার থেকে। একটি উল্লেখযোগ্য হলো “বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ”। 
কয়েকটি শব্দ ও তার অর্থ দেবো আশা করি ভালোলাগবে।
ভেঁউট নাড়ুঃ শালুক ফুলের পাকা বীজ থেকে প্রস্তুত হয় যে নাড়ু।
টেরাকোটা ফলকঃ পোড়ামাটি দিয়ে তৈরী যে ফলক।



শুনেছি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবছর শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেয়েছে “নাদের অ্যান্ড সিমিন: এ সেপারেশন”। 
ছবিটি দেখার ইচ্ছে আছে। পরিচালক আসগর ফরহাদি সমস্যা-জর্জরিত এক দম্পতির কাহিনি তুলে ধরেছেন।


কেউ কি একুশের প্রথম আলো পড়েছেন? সেখানে গোলাম মুরশিদ স্যারের একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে; “সংকটের মুখোমুখি বাংলা ভাষা”। 
একটি নিরিক্ষা তিনি চালিয়েছিলেন। তার নিজের ভাষায়; “কদিন আগে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ডক্টরেট করা এক বাংলার অধ্যাপিকাকে ৩০টি বানান লিখতে দিয়েছিলাম। তিনি তার মধ্যে ১২টি বানান শুদ্ধ করে লিখতে পারেননি। যেসব বানান তিনি ভুল লিখেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে ছিল ‘স্বাস্থ্য’, ‘মনোবেদনা’, ‘গ্রন্থস্বত্ব’, ‘মহত্ত্ব’, ‘দ্ব্যর্থহীন’, ও ‘দারিদ্র্য’। 
বানানে তাঁর দারিদ্র্য দেখে কেবল অবাক হইনি, বরং রীতিমতো ব্যথিত হয়েছিলাম। তিনি ‘ক্রীতদাস’ ও ‘স্বায়ত্তশাসন’ লিখতেও ভুল করেছিলেন। ‘কৃত’ আর ‘ক্রীত’-এর পার্থক্য তিনি জানেন না। ‘আয়ত্ত’ বানানও তাঁর আয়ত্তাধীন নয়। এই অধ্যাপিকার অথবা তাঁর মতো আরও যাঁরা আপাতদৃষ্টিতে উচ্চশিক্ষিত, তাঁদের বাইরের জৌলুশ থাক, অথবা না-ই থাক, জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁদের এই লজ্জাজনক দারিদ্র্য তাঁরা ঢাকবেন কোথায়?
অন্য যাঁদের বানান পরীক্ষা নিয়েছিলাম, তাঁদের কেউই এমএ পাসের কম নন। কিন্তু তাঁদেরই বেশ কয়েকজন ‘জ্যৈষ্ঠ’ বানানটা পর্যন্ত লিখতে পারেননি। ভেবে অবাক হই, এ রকম অতি সাধারণ শব্দের বানান লিখতেই যদি তাঁরা ব্যর্থ হন, তাহলে পুরো বাক্য তাঁরা লিখবেন কী করে? অথবা তাঁরা নিজের থেকে একটা বাক্য লিখলে সেই বাক্যের চেহারা কী দাঁড়াবে তা আমরা কেবল অনুমান করতে পারি। অথচ আমাদের বাপ-দাদাদের মধ্যে বিএ, এমএ পাস খুব কমই ছিলেন, বেশির ভাগ ছিলেন ‘আন্ডার ম্যাট্রিক’। 
তাঁরা আমাদের চেয়ে ঢের শুদ্ধ বানান জানতেন। সাধু ভাষায় লিখতেন ঠিকই, কিন্তু শুদ্ধ ভাষায় একটা পোস্টকার্ড লিখতে পারতেন। এ যুগের বিএ, এমএদের কজন শুদ্ধ বানানে একটা ছোট চিঠি লিখতে পারবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে”।
আরো মজার কিছু লাইন পড়ুন, গোলাম মুরশিদ বলছেন, “বাক্য গঠনে এবং শব্দ চয়নের ক্ষেত্রেও। বারবার লক্ষ করি শিক্ষিত লোকেরাও বাক্য শুরু করেন একভাবে, ‘বাট’ সেভাবে শেষ করতে পারেন না। ‘সো’ বাক্যটাকে অসমাপ্ত রাখেন অথবা বাক্যটাকে ভিন্ন পথে নিয়ে যান। এই শিক্ষিত লোকদের শব্দভান্ডার অত্যন্ত সীমিত, ইংরেজি শব্দ যৎকিঞ্চিৎ জানলেও পুরো বাক্য বলার ক্ষমতা নেই, তাই তাঁরা ‘বাট’ আর ‘সো’-এর ভেজাল দিয়ে কথা বলেন। বাংলা শব্দ কী হবে, তা ‘আস্ক’ করেন সহকর্মীকে।”


ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে আমি নিজেও রোমান হরফে বাংলা লিখতে মাঝে মাঝে বাধ্য হই, তাই বলে সেটা বাংলাকে অবহেলা বা অবমানোনা করে নয়। আমি যতদূর জানি রোমান হরফে বাংলা লিখবো না এটাও ছিল ভাষা আন্দোলনের একটি অংশ। জীবনের সর্বস্তরে এখন চলছে ভাষা বিকৃতি_ যা এক ধরনের গণহত্যা। এই একুশে পালনের অর্থ কী, যখন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হওয়ার বদলে সর্বস্তরে ভাষা বিকৃতি চলছে। এরকম চললে কী হবে বাংলা ভাষার, তা ভেবে দেখা উচিত।


গোলাম মুরশিদ শেষ করছেন এভাবে; “আমাদের প্রিয় মাতৃভাষাকে বিকৃত করার কাজে সম্প্রতি মাঠে নেমেছে বড় বড় কিছু কোম্পানি। এরা পত্রপত্রিকায় বাংলা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে রোমান হরফে লিখে। পত্রিকাগুলো টাকা চায়। তাই বিজ্ঞাপনে যা-ই লেখা হোক না কেন, তারা সেসব ছাপিয়ে দেয় বিনা প্রতিবাদে। বাংলা বিজ্ঞাপন রোমান হরফে লিখে এই কোম্পানিগুলো কার কাছে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে চায়, আপাতদৃষ্টিতে সেটা বোঝা মুশকিল। তবে মনে হয়, এসব বিজ্ঞাপনের পাঠক হলো আমাদের দেশের ইংরেজি মাধ্যমে পড়া তরুণ-তরুণীরা। এই তরুণেরা ইংরেজি কতটা শিখেছে, সে সম্পর্কে অবশ্যই প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু বাংলা যে শেখেনি, এমনকি অনেকে বাংলা বর্ণমালাও চেনে না, এটা জানা কথা। এই তরুণদের গোষ্ঠী ছাড়া কোম্পানিগুলো আর কার জন্য রোমান হরফে বাংলা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করবে? আমাদের দেশের শতকরা কতজন পড়তে পারে রোমান হরফ? বেশি নয়। এ কথা জানা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো যদি রোমান হরফে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে তাহলে বলতে হবে, তারা তা করছে সজ্ঞানে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। আর এঁরা যদি আমাদের বাংলা হরফ ভুলিয়ে দিয়ে রোমান হরফে বাংলা লেখার রীতি চালু করতে চায়, তাহলে আমাদের একটাই জিজ্ঞাস্য, যদি রোমান হরফেই বাংলা লিখব, তাহলে ভাষা আন্দোলন করে রক্ত ঝরানোর কী দরকার ছিল? অথবা কী দরকার ছিল একাত্তরের ভয়ানক রক্তাক্ত সংগ্রামের?”


বইমেলা শেষের পথে আর মাত্র কয়েকদিন। এবারের মেলা কেনো যেন জমলো না। কারনটা কি বিশ্বকাপ? আমার মনে হয় না। মেলায় এবার উল্লেখ করার মতো বইয়ের সংখ্যা একেবারেই হাতে  গোনা। বছরের এই একটি সময় আমি আগ্রহ নিয়ে বই কিনি। ভালো বই না পেলে ভিষণ মন খারাপ হয়। 
গতবছর যেমন বেরিয়েছিল হরিশংকর জলদাসের দহনকাল। বাংলা ভাষায় লেখা হয়নি এরকম উপন্যাস আগে কখনো। হরিশংকর জলদাসের দহনকাল সমুদ্রসংগ্রামী ও নদীসংলগ্ন কৈবর্তসম্প্রদায়ের জীবনকথা। এতে অন্তর্ভূত হয়েছে বঞ্চিত-পীড়িত-শোষিত ধীবরশ্রেণীর আনন্দ-কান্না, জন্ম-মৃত্যু; তাদের প্রতিবাদ-প্রতিশোধ ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রায় অর্ধশত বছর পর হরিশংকরই নিঃসঙ্গ একজন, যিনি সাগর ও সমাজের নির্মম অভিজ্ঞতায় এবং অন্ধকার-ছেঁড়া আলোকিত অভিজ্ঞানের অন্তর্টানে রচনা করেছেন জেলেসম্প্রদায়ের কথকতা।
জেলেপুত্র হরিদাসের বেড়ে ওঠার সমান্তরালে নির্মিত হয়েছে কৈবর্তসমাজের জাতপাতের শোষণ, অত্যাচার, দারিদ্র্য, ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদীদের অপকৌশলের বয়ান। হরিদাস কী করে ওই সব অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ক্ষরিত সময়স্রোতের বিপরীতে শিক্ষা অর্জন করল, কী করে তার অনুভূমিক জীবন উল্লম্ব সময় ও সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হলো—তারই শব্দকথা লেখকের আধেয়। হরিদাসের সংঘাতময় জীবনকাঠামোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে প্রতীকপ্রতিম কিছু চরিত্র। ওদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ও জীবনসত্তায় দহনকাল হয়ে উঠেছে বহুস্বরিত।
উপন্যাসটির মূল ঘটনাবর্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় উপঘটনাচিত্র; ইতিহাসের টানে জেলেসম্প্রদায়ের জীবন জড়িয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে। উপন্যাসের এই পর্যায়ে উদ্ঘাটিত হয় যে নিম্নবর্গের প্রতিরোধ-পদ্ধতি ও আত্মরক্ষার উদ্ভাবনা উচ্চবর্গের নেতৃত্ব ছাড়াই সংঘটিত হতে পারে। তারা জৈবিক নিয়মেই প্রত্যাঘাত করে বিরুদ্ধ শক্তিকে।
দহনকাল কেবল নিম্নবর্গের জীবনছবিই নয়, এটি দুঃসময়তাড়িত মানুষের অস্তিত্বসংকট ও সংগ্রামের প্রতিবেদন। বাংলাদেশের উচ্চবর্গ, মধ্যবিত্ত, গ্রামীণ ও শহুরে জীবনায়নের বৃহৎ বৃত্তে দহনকাল ভিন্নমাত্রার উপন্যাস। সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের অবিচলতায়, নানা চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দুর লক্ষ্যমুখী বিচিত্র ব্যবহারে, প্রমিত ভাষা ও উপভাষার সমবায়ে স্পন্দিত হয়েছে দহনকাল-এর বয়ান।


শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন আবারো পড়ছি। এবই বার বার পড়া যায়। এই বই নিয়ে পারভেজ (কর্ণেল) এর সাথে হয়েছিল প্রতিযোগিতা।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অনেক কিছুই হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেক কিছুই হবে। তবে এবার যেটা হতে যাচ্ছে সেটা এবারই প্রথম। রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রাপালা নির্মাণ করল লোকনাট্য গোষ্ঠী। 'সামান্য ক্ষতি' কবিতা অবলম্বনে পালাটি রচনা করেছেন ব্রজেন্দ্র কুমার দে।


যেদিন শুনেছিলাম স্বর্ণ পাম ২০১০ জিতে নিয়েছে কান উৎসবে মুভি “আংকল বুনমি হু ক্যান রিকল হিজ পাস্ট লাইভস” সেদিন থেকেই দেখার প্রবল আগ্রহ জেগেছিল। অবশেষে মুভিটা হাতে পেয়ে দেখে ফেললাম এক নিমেষে। ছবিটির পরিচালক থাইল্যান্ডের অ্যাপিচাটপং উইরাসেথাকল। নামটি বেশ খটমটে হওয়ায় পরিচালক বাধ্য হয়ে শেষে সবার কাছে নিজের পরিচয় দিয়েছেন ‘জো’ নামে। ছবির বিষয়-আশয় তার চেয়েও জটিলতর।
মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষ, তাঁর প্রয়াত স্ত্রী এবং হারিয়ে যাওয়া ছেলে আর বিচিত্র সব অশরীরী চরিত্র। এসব মিলিয়ে অ্যাপিচাটপংয়ের ছবি আংকল বুনমি।
আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন।